সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পোস্টগুলি

সবার আমি ছাত্র - সুনির্মল বসু

আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাই রে; কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর পাই রে। পাহাড় শিখায় তাহার সমান হই যেন ভাই মৌন-মহান্, খোলা মাঠের উপদেশে— দিল্-খোলা হই তাই রে। সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয় আপন তেজে জ্বলতে, চাঁদ শিখালো হাসতে মেদুর, মধুর কথা বলতে। ইঙ্গিতে তার শিখায় সাগর,— অন্তর হোক রত্ন-আকর; নদীর কাছে শিক্ষা পেলাম আপন বেগে চলতে। মাটির কাছে সহিষ্ণুতা পেলাম আমি শিক্ষা, আপন কাজে কঠোর হতে পাষাণ দিল দীক্ষা। ঝরনা তাহার সহজ গানে গান জাগালো আমার প্রাণে, শ্যাম বনানী সরসতা আমায় দিল ভিক্ষা। বিশ্ব-জোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র, নানান ভাবের নতুন জিনিস, শিখছি দিবারাত্র; এই পৃথিবীর বিরাট খাতায় পাঠ্য যে-সব পাতায় পাতায়, শিখছি সে-সব কৌতূহলে সন্দেহ নাই মাত্র॥ সবার আমি ছাত্র — কবিতা পরিচিতি ‘সবার আমি ছাত্র’ বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং জীবনমুখী কবিতা। এটি মূলত প্রকৃতিকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে তুলে ধরার এক অনুপম প্রয়াস। কবি: সুনির্মল বসু। বিষয়বস্তু: প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান থেকে মানুষের নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা গ্রহণের আবশ্যকতা। ✨ কবিতার মূল ভাব এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে—আকাশ, বাতাস, পাহাড়, ...

বনলতা সেন - জীবনানন্দ দাশ

  হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে; আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন। চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর, তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন। সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল; পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল; সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন। বনলতা সেন — কবিতা পরিচিতি ‘বনলতা সেন’ আধুনিক বাংলা কবিতার এক মাইলফলক। এটি জীবনানন্দ দাশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং পঠিত কবিতা। নির্জনতার কবি জীবনানন্দ এই কবিতায় ইতিহাস, ঐতি...

কাজলা দিদি – যতীন্দ্র মোহন বাগচী

বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই? পুকুর ধারে, নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাই জ্বলে, ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই, মাগো, আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই? সেদিন হতে দিদিকে আর কেনই-বা না ডাকো, দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো? খাবার খেতে আসি যখন দিদি বলে ডাকি, তখন ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো, আমি ডাকি, – তুমি কেন চুপটি করে থাকো? বল মা, দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে? কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল-বিয়ে হবে! দিদির মতন ফাঁকি দিয়ে আমিও যদি লুকোই গিয়ে- তুমি তখন একলা ঘরে কেমন করে রবে? আমিও নাই দিদিও নাই কেমন মজা হবে! ভূঁইচাঁপাতে ভরে গেছে শিউলি গাছের তল, মাড়াস নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল; ডালিম গাছের ডালের ফাঁকে বুলবুলিটি লুকিয়ে থাকে, দিস না তারে উড়িয়ে মা গো ছিঁড়তে গিয়ে ফল; দিদি এসে শুনবে যখন, বলবি কি মা বল| বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই এমন সময়, মাগো, আমার কাজলা দিদি কই? বেড়ার ধারে, পুকুর পাড়ে ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোঁপে-ঝাড়ে; নেবুর গন্ধে ঘুম আসে না, তাইতো জেগে রই; রাত হলো যে, মাগো, আমার কাজলা দিদি কই? কাজলা দিদি — কবিতা পরিচিতি ‘কাজলা দিদ...

কোরবানী – কাজী নজরুল ইসলাম

 ওরে        হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন ! দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুব্ধ মন !                  ধ্বনি উঠে রণি’ দূর বাণীর, –                  আজিকার এ খুন কোরবানীর !                  দুম্বা-শির        রুম্-বাসীর শহীদের শির সেরা আজি !- রহমান কি রুদ্র নন ?                  ব্যাস ! চুপ খামোশ রোদন ! আজ         শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে , শির দে বৎস” শোন ! ওরে           হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন ! ওরে           হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !                          খন্জর মারো গর্দ্দানেই,                          পন্...

সুভা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তর্জমা করিতে হয় না— মন আপনি তাহার উপরে ছায়া ফেলে; ভাব আপনি তাহার উপরে কখনো প্রসারিত কখনো মুদিত হয়। কখনো উজ্জ্বলভাবে জলিয়া উঠে, কখনো ম্লানভাবে নিবিয়া আসে; কখনো অস্তমান চন্দ্রের মতো অনিমেষভাবে চাহিয়া থাকে, কখনো দ্রুত চঞ্চল বিদ্যুতের মতো দিগ্‌বিদিকে ঠিকরিয়া উঠে। মুখের ভাব বৈ আজন্মকাল যাহার অন্য ভাষা নাই তাহার চোখের ভাষা অসীম উদার এবং অতলস্পর্শ গভীর— অনেকটা স্বচ্ছ আকাশের মতো, উদয়াস্ত এবং ছায়ালোকের নিস্তব্ধ রঙ্গভূমি। এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ত্ব আছে। এইজন্য সাধারণ বালকবালিকারা তাহাকে একপ্রকার ভয় করিত, তাহার সহিত খেলা করিত না। সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন।  গ্রামের নাম চণ্ডীপুর। নদীটি বাংলাদেশের একটি ছোটো নদী, গৃহস্থঘরের মেয়েটির মতো; বহুদূর পর্যন্ত তাহার প্রসার নহে; নিরলসা তন্বী নদীটি আপন কূল রক্ষা করিয়া কাজ করিয়া যায়; দুই ধারের গ্রামের সকলেরই সঙ্গে তাহার যেন একটা-না-একটা সম্পর্ক আছে। দুই ধারে লোকালয় এবং তরুচ্ছায়াঘন উচ্চ তট; নিমতল দিয়া গ্রামলক্ষ্মী স্রোতস্বিনী আত্মবিস্মৃত দ্রুত পদক্ষেপে প্রফুল্লহৃদয়ে আপনার অসংখ্য কল্যা...

বিদ্রোহী - কাজী নজরুল ইসলাম

 বল বীর –                   বল উন্নত মম শির! শির       নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!                                           বল বীর – বল        মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’              চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি’              ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,              খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া              উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর! মম        ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!                                           বল বীর –              আমি    ...

সোনার তরী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান-কাটা হল সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা– কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥ একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা— চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা। পরপারে দেখি আঁকা তরুছায়ামসী-মাখা গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলা— এপারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা॥ গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে! দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে। ভরা পালে চলে যায়, কোনো দিকে নাহি চায়, ঢেউগুলি নিরুপায় ভাঙে দু ধারে— দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে॥ ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে? বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে। যেয়ো যেথা যেতে চাও, যারে খুশি তারে দাও— শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণিক হেসে আমার সোনার ধান কূলেতে এসে॥ যত চাও তত লও তরণী-পরে। আর আছে?— আর নাই, দিয়েছি ভরে॥ এতকাল নদীকূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে সকলি দিলাম তুলে থরে বিথরে— এখন আমারে লহো করুণা ক’রে॥ ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি। শ্রাবণগগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে, শূন্য নদীর তীরে রহি নু পড়ি— যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী॥ সোনার তরী — কবিতা পরিচিতি সোনার তরী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত ও প্রতীকধর...