সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কাজলা দিদি – যতীন্দ্র মোহন বাগচী

বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই

মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?

পুকুর ধারে, নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাই জ্বলে,

ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই,

মাগো, আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?


সেদিন হতে দিদিকে আর কেনই-বা না ডাকো,

দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?


খাবার খেতে আসি যখন দিদি বলে ডাকি, তখন

ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো,

আমি ডাকি, – তুমি কেন চুপটি করে থাকো?

বল মা, দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে?

কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল-বিয়ে হবে!

দিদির মতন ফাঁকি দিয়ে আমিও যদি লুকোই গিয়ে-

তুমি তখন একলা ঘরে কেমন করে রবে?

আমিও নাই দিদিও নাই কেমন মজা হবে!


ভূঁইচাঁপাতে ভরে গেছে শিউলি গাছের তল,

মাড়াস নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল;

ডালিম গাছের ডালের ফাঁকে বুলবুলিটি লুকিয়ে থাকে,

দিস না তারে উড়িয়ে মা গো ছিঁড়তে গিয়ে ফল;

দিদি এসে শুনবে যখন, বলবি কি মা বল|


বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই

এমন সময়, মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?

বেড়ার ধারে, পুকুর পাড়ে ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোঁপে-ঝাড়ে;

নেবুর গন্ধে ঘুম আসে না, তাইতো জেগে রই;

রাত হলো যে, মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?


কাজলা দিদি — কবিতা পরিচিতি

‘কাজলা দিদি’ বাংলা সাহিত্যের শিশুতোষ ও শোকাতুর কবিতার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি কাজ। এটি শৈশবের নস্টালজিয়া এবং প্রিয়জন হারানোর এক গভীর ও মর্মস্পর্শী দলিল।

  • কবি: যতীন্দ্রমোহন বাগচী।

  • ধরন: করুণ ও স্মৃতিকাতর কবিতা।

✨ কবিতার মূল ভাব

কবিতাটি একটি অবুঝ শিশু এবং তার চিরতরে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় বড় বোন 'কাজলা দিদি'কে কেন্দ্র করে আবর্তিত। শিশুটি বুঝতে পারে না মৃত্যু কী বা তার দিদি কেন আর ফিরে আসছে না। সে তার মায়ের কাছে দিদির অনুপস্থিতি নিয়ে বারবার প্রশ্ন করে, কিন্তু মা কোনো উত্তর দিতে পারেন না। মৃত্যুর রূঢ় সত্য আর শিশুর অমল সারল্যের এক অপূর্ব সমন্বয় এই কবিতা।

🌿 চিত্রকল্প ও আবহ

  • বাঁশবাগান ও জোনাকি: অন্ধকারে জোনাকি জ্বলা বাঁশবাগান এখানে এক রহস্যময় এবং বিষণ্ণ পরিবেশ তৈরি করে।

  • শোলক বলা ও খেলা: দিদির সাথে কাটানো মধুর সময়গুলো শিশুটির কাছে এখনো জীবন্ত, যা তার শূন্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

  • মায়ের নীরবতা: মা জানেন দিদি আর ফিরবে না, কিন্তু এই কঠিন সত্যটি শিশুকে বলার ভাষা তাঁর নেই। মায়ের এই নীরব কান্না কবিতার করুণ রসকে গভীরতর করেছে।

📌 কবিতার বৈশিষ্ট্য

  • পল্লী-প্রকৃতির রূপায়ণ: গ্রামবাংলার অতি পরিচিত ঝোপঝাড়, শিউলি ফুল আর নেবুর পাতার বর্ণনায় কবিতাটি জীবন্ত হয়ে ওঠে।

  • সহজ ও সাবলীল ছন্দ: অত্যন্ত সহজ শব্দে এক গভীর জীবনদর্শন ও শোক গাঁথা তুলে ধরা হয়েছে।

  • আবেগের তীব্রতা: কবিতাটি পাঠমাত্রই প্রতিটি পাঠকের মনে শৈশবের কোনো হারানো স্মৃতি বা প্রিয়জনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

📝 বিখ্যাত পংক্তি

“বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?”

“বেড়ার ধারে নেবুর পাতায় করমচাটি হেলে, দিদি কি আর আসবে না মা এই আমাদের খেলে?”

🎯 গুরুত্ব বা শিক্ষা

‘কাজলা দিদি’ আমাদের জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্ব এবং বিচ্ছেদের বেদনাকে চিনতে শেখায়। এটি ভাই-বোনের মধ্যকার স্বর্গীয় সম্পর্কের এক অনন্য উদাহরণ। জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে কীভাবে একটি শিশুর চোখ দিয়ে দেখা যায়, তা এই কবিতার মাধ্যমে ফুটে উঠেছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সোনার তরী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান-কাটা হল সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা– কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥ একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা— চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা। পরপারে দেখি আঁকা তরুছায়ামসী-মাখা গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলা— এপারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা॥ গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে! দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে। ভরা পালে চলে যায়, কোনো দিকে নাহি চায়, ঢেউগুলি নিরুপায় ভাঙে দু ধারে— দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে॥ ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে? বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে। যেয়ো যেথা যেতে চাও, যারে খুশি তারে দাও— শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণিক হেসে আমার সোনার ধান কূলেতে এসে॥ যত চাও তত লও তরণী-পরে। আর আছে?— আর নাই, দিয়েছি ভরে॥ এতকাল নদীকূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে সকলি দিলাম তুলে থরে বিথরে— এখন আমারে লহো করুণা ক’রে॥ ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি। শ্রাবণগগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে, শূন্য নদীর তীরে রহি নু পড়ি— যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী॥ সোনার তরী — কবিতা পরিচিতি সোনার তরী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত ও প্রতীকধর...

বীরপুরুষ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে। তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ’ড়ে দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক’রে, আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে। রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে রাঙা ধূলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে। সন্ধ্যে হল, সূর্য নামে পাটে, এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে। ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই, কোনোখানে জনমানব নাই, তুমি যেন আপন-মনে তাই ভয় পেয়েছ-ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’ আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মা গো, ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’ আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে- অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো। তুমি যেন বললে আমায় ডেকে, ‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’ এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’ ওই – যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে! তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে, বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে, ‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো!’ তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’ আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে।’ ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে, কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা। কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে, কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।। এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক’রে, ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে। আমি ...

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজি এ প্রভাতে রবির কর              কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,       কেমনে  পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান! না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।              জাগিয়া উঠেছে প্রাণ, ওরে       উথলি উঠেছে বারি, ওরে       প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।                 থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,                 শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,                 ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল                 গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।                 হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়                 ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায় – বাহিরেতে চায়, দেখিতে না পায় কোথায় কারার দ্বার।               ...