সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কোরবানী – কাজী নজরুল ইসলাম

 ওরে        হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

দুর্বল! ভীরু! চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুব্ধ মন !

                 ধ্বনি উঠে রণি’ দূর বাণীর, –

                 আজিকার এ খুন কোরবানীর !

                 দুম্বা-শির        রুম্-বাসীর

শহীদের শির সেরা আজি !- রহমান কি রুদ্র নন ?

                 ব্যাস ! চুপ খামোশ রোদন !

আজ         শোর ওঠে জোর “খুন দে, জান দে , শির দে বৎস” শোন !

ওরে           হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !


ওরে           হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

                         খন্জর মারো গর্দ্দানেই,

                         পন্জরে আজি দরদ্ নেই,

                         মর্দানী’ই পর্দা নেই,

                 ডরতা নেই আজ খুন্-খারাবীতে রক্ত-লুব্ধ-মন !

                         খুনে        খেলবো খুন-মাতন !

দুনো          উনমাদনাতে সত্য মুক্তি আনতে যুঝবো রণ ।

ওরে           হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন


ওরে           হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

                          চ’ড়েছে খুন আজ খুনিয়ারার

                          মুসলিমে সারা দুনিয়াটার !

                          ‘জুলফেকার’ খুলবে তার

                  দু’ধারী ধার শেরে-খোদার , রক্তে-পূত-বদন !

                          খুনে আজকে রুধবো মন

ওরে            শক্তি-হস্তে মুক্তি, শক্তি রক্তে সুপ্ত শোন্ ।

ওরে            হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন


ওরে            হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

                           আস্তানা সিধা রাস্তা নয়,

                           ‘আজাদী মেলে না পস্তানো’য় !

                  দস্তা নয়            সে সস্তা নয় !

হত্যা নয় কি মৃত্যুও ? তবে রক্তে লুব্ধ কোন্_

                                কাঁদে-শক্তি-দুস্থ শোন_

“এয়্            ইবরাহীম্ আজ কোরবানী কর শ্রেষ্ঠ পুত্র ধন !”

ওরে            হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন


ওরে            হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

                                এ তো নহে লহু তরবারের

                                ঘাতক জালিম জোরবারের

                                কোরবানের জোরজানের

                   খুন এ যে, এতে গোদ্র্দ ঢের রে, এ ত্যাগে ‘বুদ্ধ’ মন !

                                            এতে মা রাখে পুত্র পণ !

তাই             জননী হাজেরা বেটারে পরা’লো বলির পূত বসন !

ওরে             হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন


ওরে             হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

                                এই দিনই ‘মিনা’-ময়দানে

                                পুত্র-স্নেহের গর্দানে

                                ছুড়ি হেনে ‘খুন ক্ষরিয়ে নে’

                    রেখেছে আব্বা ইবরাহীম সে আপনা রুদ্র পণ !

                                           ছি ছি ! কেঁপোনা ক্ষুদ্র মন !

আজ            জল্লাদ নয় , প্রহ্লাদ-সম মোল্লা খুন-বদন !

ওরে              হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন


ওরে              হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

দ্যাখ্             কেঁপেছে ‘আরশ’ আসমানে

                                 মন-খুনী কি রে রাশ মানে ?

                                 ত্রাস প্রাণে ? তবে রাস্তা নে !

                    প্রলয় বিষাণ ‘কিয়ামতে’ তবে বাজবে কোন্ বোধন ?

                                            সে কি সৃষ্টি-সংশোধন ?

ওরে              তাথিয়া তাথিয়া নাচে ভৈরব বাজে ডম্বরু শোন্ !-

ওরে              হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !


ওরে              হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

                                  মুসলিম-রণ-ডঙ্কা সে,

                                  খুন দেখে করে শঙ্কা কে ?

                                  টঙ্কারে অসি ঝঙ্কারে,

ওরে               হুঙ্কারে , ভাঙি গড়া ভীম কারা, ল’ড়বো রণ-মরণ !

                                               ঢালে বাজবে ঝন্-ঝনন্ !

ওরে               সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন !

ওরে               হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !


ওরে               হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !

                                  জোর চাই, আর যাচনা নয়,

                                  কোরবানী-দিন আজ না ওই ?

                                  বাজনা কই? সাজনা কই?

                      কাজ না আজিকে জান্ মাল দিয়ে মুক্তির উদ্র্ধরণ ?

                                                বল্ – “যুঝবো জান ভি পণ !”

ঐ                  খুনের খুঁটিতে কল্যাণ-কেতু, লক্ষ্য ঐ তোরণ,

আজ              আল্লার নামে জান্ কোরবানে ঈদের পূত বোধন ।

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদবোধন !


কোরবানী — কবিতা পরিচিতি

‘কোরবানী’ নজরুল ইসলামের এক অসামান্য বৈপ্লবিক ও ধর্মীয় চেতনার কবিতা। সাম্য ও ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এই কবিতাটি মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান উৎসব ঈদুল আযহার প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরে।

  • কবি: কাজী নজরুল ইসলাম।

  • কাব্যগ্রন্থ: এটি কবির বিখ্যাত ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত।

  • প্রেক্ষাপট: ১৯২২ সালে রচিত এই কবিতায় কবি প্রথাগত পশু বলিদানের চেয়ে মনের পশুকে বিসর্জন দেওয়া এবং সত্যের পথে আত্মত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।

✨ কবিতার মূল ভাব

‘কোরবানী’ কবিতার মূল সুর হলো আত্মত্যাগ। কবি এখানে কেবল পশু জবাইকে কোরবানী বলেননি; বরং মানুষের মনের ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা এবং ভীরুতাকে বিসর্জন দেওয়ার কথা বলেছেন। ইসলামের ইতিহাসের হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের আদর্শকে সামনে রেখে নজরুল সমকালীন পরাধীন ও শোষিত মানুষকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

⚔️ প্রতীক ও শব্দের অর্থ

  • কোরবানী: এটি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে জান-মাল বাজি রাখার প্রতীক।

  • খঞ্জর: শোষকের হাত থেকে মুক্তি এবং মনের কুপ্রবৃত্তি বিনাশের হাতিয়ার।

  • শহীদী ঈদ: ভোগবিলাসের ঈদ নয়, বরং ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আনন্দ।

📌 কবিতার বৈশিষ্ট্য

  • বিদ্রোহী ও ধর্মীয় সুরের সমন্বয়: নজরুল এখানে ধর্মের আধ্যাত্মিক দিকটিকে সামাজিক বিপ্লবের সাথে মিলিয়েছেন।

  • ওজস্বী ভাষা: কবিতার প্রতিটি শব্দে এক ধরণের উদ্দীপনা ও তেজ কাজ করে যা পাঠককে সাহসী করে তোলে।

  • জাগরণী গান: এটি মূলত ঘুমন্ত মুসলিম সমাজকে তাদের অতীত বীরত্ব ও ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার একটি উদ্দীপনামূলক সাহিত্য।

📝 বিখ্যাত পংক্তি

“ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!”

“মনের পশুরে কর জবাই, পশু সাজায়ে কী হবে ভাই?”

“শহীদী ঈদ এল রে আজ, দেখরে দেখ ওই সাজ!”

🎯 গুরুত্ব বা শিক্ষা

এই কবিতাটি আমাদের শেখায় যে, ধর্মের বাহ্যিক আচারের চেয়ে মনের শুদ্ধতা বড়। প্রকৃত কোরবানী হলো নিজের আমিত্ব ও স্বার্থকে বিলিয়ে দেওয়া। সমাজ ও জাতির প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করাই এই কবিতার প্রধান শিক্ষা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সোনার তরী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান-কাটা হল সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা– কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥ একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা— চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা। পরপারে দেখি আঁকা তরুছায়ামসী-মাখা গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলা— এপারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা॥ গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে! দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে। ভরা পালে চলে যায়, কোনো দিকে নাহি চায়, ঢেউগুলি নিরুপায় ভাঙে দু ধারে— দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে॥ ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে? বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে। যেয়ো যেথা যেতে চাও, যারে খুশি তারে দাও— শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণিক হেসে আমার সোনার ধান কূলেতে এসে॥ যত চাও তত লও তরণী-পরে। আর আছে?— আর নাই, দিয়েছি ভরে॥ এতকাল নদীকূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে সকলি দিলাম তুলে থরে বিথরে— এখন আমারে লহো করুণা ক’রে॥ ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি। শ্রাবণগগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে, শূন্য নদীর তীরে রহি নু পড়ি— যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী॥ সোনার তরী — কবিতা পরিচিতি সোনার তরী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত ও প্রতীকধর...

বীরপুরুষ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে। তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ’ড়ে দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক’রে, আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে। রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে রাঙা ধূলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে। সন্ধ্যে হল, সূর্য নামে পাটে, এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে। ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই, কোনোখানে জনমানব নাই, তুমি যেন আপন-মনে তাই ভয় পেয়েছ-ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’ আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মা গো, ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’ আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে- অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো। তুমি যেন বললে আমায় ডেকে, ‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’ এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’ ওই – যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে! তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে, বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে, ‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো!’ তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’ আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে।’ ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে, কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা। কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে, কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।। এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক’রে, ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে। আমি ...

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজি এ প্রভাতে রবির কর              কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,       কেমনে  পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান! না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।              জাগিয়া উঠেছে প্রাণ, ওরে       উথলি উঠেছে বারি, ওরে       প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।                 থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,                 শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,                 ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল                 গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।                 হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়                 ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায় – বাহিরেতে চায়, দেখিতে না পায় কোথায় কারার দ্বার।               ...