সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বীরপুরুষ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে

মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।


তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ’ড়ে

দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক’রে,

আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে

টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।

রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে

রাঙা ধূলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে।


সন্ধ্যে হল, সূর্য নামে পাটে,

এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে।

ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই,

কোনোখানে জনমানব নাই,

তুমি যেন আপন-মনে তাই

ভয় পেয়েছ-ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’

আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মা গো,

ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’


আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে-

অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো।

তুমি যেন বললে আমায় ডেকে,

‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’

এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’


ওই – যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে!

তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে

ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে,

বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে

আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে,

‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো!’


তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’

আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে।’

ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,

কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে

শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।

কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,

কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।।


এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক’রে,

ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে।

আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে

বলছি এসে, ‘লড়াই গেছে থেমে,’

তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে

চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে

বলছ, ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল’

কী দুর্দশাই হত তা না হলে!’

বীরপুরুষ — কবিতা পরিচিতি

বীরপুরুষ বাংলা সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় শিশু-কিশোর উপযোগী কবিতা। এটি রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিতাটি মূলত সাহস, কল্পনা ও শিশুমনের বীরত্ববোধকে কেন্দ্র করে লেখা।


✨ কবিতার মূল ভাব

“বীরপুরুষ” কবিতায় এক ছোট শিশুর কল্পনার জগৎ তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে সে নিজেকে একজন সাহসী বীর হিসেবে কল্পনা করে।

সে মনে করে সে বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধার করছে, দুর্যোগ মোকাবিলা করছে এবং সাহসিকতার মাধ্যমে সবাইকে রক্ষা করছে।

এই কবিতা শিশুমনের সাহস, কল্পনা এবং আত্মবিশ্বাসকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে।


🎯 প্রধান বার্তা

  • সাহসী হওয়া
  • কল্পনাশক্তির বিকাশ
  • মানবিক সাহায্যবোধ
  • আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা

🌟 কবিতার বৈশিষ্ট্য

  • শিশু-কিশোর উপযোগী ভাষা
  • সহজ ও সরল বর্ণনা
  • কল্পনাভিত্তিক গল্পধর্মী রচনা
  • আনন্দময় ও শিক্ষামূলক ভাব
  • জীবন্ত চিত্রায়ণ

🧠 শিক্ষণীয় দিক

এই কবিতা শিশুদের শেখায় যে:

  • সাহস শুধু শক্তি নয়, মানসিকতাও
  • কল্পনা দিয়ে বড় কিছু ভাবা যায়
  • অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ

📝 গুরুত্বপূর্ণ ভাব

“বীরপুরুষ” কবিতায় বাস্তবতার চেয়ে কল্পনার জগৎ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শিশুর মনোজগৎকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সোনার তরী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান-কাটা হল সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা– কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥ একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা— চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা। পরপারে দেখি আঁকা তরুছায়ামসী-মাখা গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলা— এপারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা॥ গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে! দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে। ভরা পালে চলে যায়, কোনো দিকে নাহি চায়, ঢেউগুলি নিরুপায় ভাঙে দু ধারে— দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে॥ ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে? বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে। যেয়ো যেথা যেতে চাও, যারে খুশি তারে দাও— শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণিক হেসে আমার সোনার ধান কূলেতে এসে॥ যত চাও তত লও তরণী-পরে। আর আছে?— আর নাই, দিয়েছি ভরে॥ এতকাল নদীকূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে সকলি দিলাম তুলে থরে বিথরে— এখন আমারে লহো করুণা ক’রে॥ ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি। শ্রাবণগগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে, শূন্য নদীর তীরে রহি নু পড়ি— যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী॥ সোনার তরী — কবিতা পরিচিতি সোনার তরী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত ও প্রতীকধর...

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজি এ প্রভাতে রবির কর              কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,       কেমনে  পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান! না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।              জাগিয়া উঠেছে প্রাণ, ওরে       উথলি উঠেছে বারি, ওরে       প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।                 থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,                 শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,                 ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল                 গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।                 হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়                 ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায় – বাহিরেতে চায়, দেখিতে না পায় কোথায় কারার দ্বার।               ...