আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।
থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,
শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,
ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল
গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।
হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়
ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায় –
বাহিরেতে চায়, দেখিতে না পায় কোথায় কারার দ্বার।
কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,
চারি দিকে তার বাঁধন কেন!
ভাঙ্ রে হৃদয়, ভাঙ্ রে বাঁধন,
সাধ্ রে আজিকে প্রাণের সাধন,
লহরীর পরে লহরী তুলিয়া
আঘাতের পরে আঘাত কর্।
মাতিয়া যখন উঠেছে পরান
কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!
উথলি যখন উঠেছে বাসনা
জগতে তখন কিসের ডর!
আমি ঢালিব করুণাধারা,
আমি ভাঙিব পাষাণকারা,
আমি জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া
আকুল পাগল-পারা।
কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া,
রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া,
রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া দিব রে পরান ঢালি।
শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,
ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব,
হেসে খলখল গেয়ে কলকল তালে তালে দিব তালি।
এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে মোর,
এত সুখ আছে, এত সাধ আছে – প্রাণ হয়ে আছে ভোর।।
কী জানি কী হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ –
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
ওরে, চারি দিকে মোর
এ কী কারাগার ঘোর –
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্।
ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি,
এসেছে রবির কর।
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ — কবিতা পরিচিতি
নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ বাংলা সাহিত্যের একটি বিখ্যাত ভাবগম্ভীর ও দার্শনিক কবিতা। এটি রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
✨ কবিতার মূল ভাব
এই কবিতায় কবি একটি নির্ঝর (ঝর্ণা)-কে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শুরুতে ঝর্ণাটি পাহাড়ের গভীরে শান্তভাবে ঘুমিয়ে থাকে, অর্থাৎ তার শক্তি ও সম্ভাবনা অজানা অবস্থায় থাকে।
কিন্তু একসময় সেই ঝর্ণা জেগে ওঠে, বাধা ভেঙে বেরিয়ে আসে এবং প্রবল শক্তিতে প্রবাহিত হয়।
এই “জাগরণ” বা “স্বপ্নভঙ্গ” মূলত মানুষের ভেতরের প্রতিভা, শক্তি ও চেতনার জাগরণকে বোঝায়।
🌊 প্রতীকী অর্থ
- নির্ঝর (ঝর্ণা) → মানুষের অন্তর্নিহিত প্রতিভা
- ঘুম → অজ্ঞানতা বা নিষ্ক্রিয়তা
- জাগরণ → আত্মউপলব্ধি ও বিকাশ
- প্রবাহ → সৃষ্টিশীলতা ও জীবনের গতি
🎯 প্রধান বার্তা
- মানুষের ভেতরে অসীম সম্ভাবনা থাকে
- সময় ও অনুপ্রেরণায় সেই শক্তি জেগে ওঠে
- আত্মবিশ্বাস ও চেতনা জাগানো জরুরি
- জীবন থেমে থাকার জন্য নয়, এগিয়ে যাওয়ার জন্য
🌟 কবিতার বৈশিষ্ট্য
- গভীর দার্শনিক ভাবনা
- প্রতীকধর্মী উপস্থাপন
- প্রকৃতির মাধ্যমে মানবজীবনের ব্যাখ্যা
- শক্তিশালী চিত্রকল্প
- অনুপ্রেরণামূলক বার্তা
🧠 শিক্ষণীয় দিক
এই কবিতা শেখায় যে:
- প্রতিটি মানুষের ভেতরে “নির্ঝর” আছে
- তাকে জাগাতে হয়
- আত্মবিশ্বাসই জীবনের মূল শক্তি
📝 সারসংক্ষেপ
“নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” শুধু একটি কবিতা নয়, এটি মানুষের আত্মজাগরণের প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্তর্নিহিত শক্তি জাগিয়ে তুলতে পারলেই জীবন অর্থবহ হয়ে ওঠে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন