সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজি এ প্রভাতে রবির কর

             কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,

      কেমনে  পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!

না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।

             জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,

ওরে       উথলি উঠেছে বারি,

ওরে       প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।

                থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,

                শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,

                ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল

                গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।

                হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়

                ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায় –

বাহিরেতে চায়, দেখিতে না পায় কোথায় কারার দ্বার।

                কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,

                চারি দিকে তার বাঁধন কেন!

                ভাঙ্ রে হৃদয়, ভাঙ্ রে বাঁধন,

                সাধ্ রে আজিকে প্রাণের সাধন,

                লহরীর পরে লহরী তুলিয়া

                আঘাতের পরে আঘাত কর্।

                মাতিয়া যখন উঠেছে পরান

                কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!

                উথলি যখন উঠেছে বাসনা

                জগতে তখন কিসের ডর!


                আমি    ঢালিব করুণাধারা,

                আমি    ভাঙিব পাষাণকারা,

                আমি    জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া

                            আকুল পাগল-পারা।

                কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া,

                রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া,

রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া দিব রে পরান ঢালি।

                শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,

                ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব,

হেসে খলখল গেয়ে কলকল তালে তালে দিব তালি।

এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে মোর,

এত সুখ আছে, এত সাধ আছে – প্রাণ হয়ে আছে ভোর।।

কী জানি কী হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ –

দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।

                ওরে, চারি দিকে মোর

                এ কী কারাগার ঘোর –

ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্।

ওরে আজ     কী গান গেয়েছে পাখি,

এসেছে রবির কর।

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ — কবিতা পরিচিতি

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ বাংলা সাহিত্যের একটি বিখ্যাত ভাবগম্ভীর ও দার্শনিক কবিতা। এটি রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


✨ কবিতার মূল ভাব

এই কবিতায় কবি একটি নির্ঝর (ঝর্ণা)-কে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শুরুতে ঝর্ণাটি পাহাড়ের গভীরে শান্তভাবে ঘুমিয়ে থাকে, অর্থাৎ তার শক্তি ও সম্ভাবনা অজানা অবস্থায় থাকে।

কিন্তু একসময় সেই ঝর্ণা জেগে ওঠে, বাধা ভেঙে বেরিয়ে আসে এবং প্রবল শক্তিতে প্রবাহিত হয়।

এই “জাগরণ” বা “স্বপ্নভঙ্গ” মূলত মানুষের ভেতরের প্রতিভা, শক্তি ও চেতনার জাগরণকে বোঝায়।


🌊 প্রতীকী অর্থ

  • নির্ঝর (ঝর্ণা) → মানুষের অন্তর্নিহিত প্রতিভা
  • ঘুম → অজ্ঞানতা বা নিষ্ক্রিয়তা
  • জাগরণ → আত্মউপলব্ধি ও বিকাশ
  • প্রবাহ → সৃষ্টিশীলতা ও জীবনের গতি

🎯 প্রধান বার্তা

  • মানুষের ভেতরে অসীম সম্ভাবনা থাকে
  • সময় ও অনুপ্রেরণায় সেই শক্তি জেগে ওঠে
  • আত্মবিশ্বাস ও চেতনা জাগানো জরুরি
  • জীবন থেমে থাকার জন্য নয়, এগিয়ে যাওয়ার জন্য

🌟 কবিতার বৈশিষ্ট্য

  • গভীর দার্শনিক ভাবনা
  • প্রতীকধর্মী উপস্থাপন
  • প্রকৃতির মাধ্যমে মানবজীবনের ব্যাখ্যা
  • শক্তিশালী চিত্রকল্প
  • অনুপ্রেরণামূলক বার্তা

🧠 শিক্ষণীয় দিক

এই কবিতা শেখায় যে:

  • প্রতিটি মানুষের ভেতরে “নির্ঝর” আছে
  • তাকে জাগাতে হয়
  • আত্মবিশ্বাসই জীবনের মূল শক্তি

📝 সারসংক্ষেপ

“নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” শুধু একটি কবিতা নয়, এটি মানুষের আত্মজাগরণের প্রতীক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্তর্নিহিত শক্তি জাগিয়ে তুলতে পারলেই জীবন অর্থবহ হয়ে ওঠে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সোনার তরী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান-কাটা হল সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা– কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥ একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা— চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা। পরপারে দেখি আঁকা তরুছায়ামসী-মাখা গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলা— এপারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা॥ গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে! দেখে যেন মনে হয়, চিনি উহারে। ভরা পালে চলে যায়, কোনো দিকে নাহি চায়, ঢেউগুলি নিরুপায় ভাঙে দু ধারে— দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে॥ ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে? বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে। যেয়ো যেথা যেতে চাও, যারে খুশি তারে দাও— শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণিক হেসে আমার সোনার ধান কূলেতে এসে॥ যত চাও তত লও তরণী-পরে। আর আছে?— আর নাই, দিয়েছি ভরে॥ এতকাল নদীকূলে যাহা লয়ে ছিনু ভুলে সকলি দিলাম তুলে থরে বিথরে— এখন আমারে লহো করুণা ক’রে॥ ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি। শ্রাবণগগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে, শূন্য নদীর তীরে রহি নু পড়ি— যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী॥ সোনার তরী — কবিতা পরিচিতি সোনার তরী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত ও প্রতীকধর...

বীরপুরুষ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে। তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চ’ড়ে দরজা দুটো একটুকু ফাঁক ক’রে, আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার ‘পরে টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে। রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে রাঙা ধূলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে। সন্ধ্যে হল, সূর্য নামে পাটে, এলেম যেন জোড়াদিঘির মাঠে। ধূ ধূ করে যে দিক-পানে চাই, কোনোখানে জনমানব নাই, তুমি যেন আপন-মনে তাই ভয় পেয়েছ-ভাবছ, ‘এলেম কোথা।’ আমি বলছি, ‘ভয় কোরো না মা গো, ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতা।’ আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে- অন্ধকারে দেখা যায় না ভালো। তুমি যেন বললে আমায় ডেকে, ‘দিঘির ধারে ওই-যে কিসের আলো!’ এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’ ওই – যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে! তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে ঠাকুর-দেবতা স্মরণ করছ মনে, বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে, ‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো!’ তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’ আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে।’ ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে, কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা। কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে, কত লোকের মাথা পড়ল কাটা।। এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক’রে, ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে। আমি ...